ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ই ফাল্গুন, ১৪২৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ইং, ৩০শে জমাদিউল-আউয়াল, ১৪৩৮ হিজরী
bartabazar viber

এখন সরষের মধুতে এক মধুময় বিল পাবনার চলনবিল
বার্তা বাজার ডেস্ক | প্রকাশিত: অপরাহ্ণ ১০:৩৩ , নভেম্বর ৩০, ২০১৬

মামুনুর রহমান,ব্যূরোচিফ পাবনা: আর কান পাতলে শোনা যাচ্ছে কবির সেই ‘কোথা যাস্ নাচি নাচি দাঁড়াবার সময়তো নেই’ মৌমাছিদের গুনগুন গানের সুর লহরি। কিছুক্ষন পর পর উড়ে উড়ে এসে মৌবাক্সে ফিরছে মধু নিয়ে ইউরোপিয়ান হাইব্রীড এপিস মেলিফেরা মৌমাছির দল। ঝাকে ঝাকে মৌমাছি উড়ে গিয়ে হলুদ বরণ সরষে ফুলে বসছে-উড়ছে। চলনবিলের বুক চিড়ে ছুটে চলা হটিকুমরুল-বনপাড়া বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের দু’ধারে এখন হলুদবরণ মাঠের এটাই চিত্রকল্প। দিগন্ত জুড়ে রাই-সরষে ফুলের হলুদ চাঁদর বিছানো। সেই হলুদ ছুঁয়েছে দিগন্তরেখায়। নয়নাভিরাম সেই সরষে খেতের আলে আলে এখন শুধুই সারি সারি মৌমাছির মৌবাক্স। এখন চলছে সরষে আবাদের ভরা মৌসুম। তাই শুরু হয়েছে চলনবিল জুড়ে সরষে ফুলের মধু সংগ্রহের উৎসবের মতো এক আমেজ। মধুতে মধুময় হয়ে উঠেছে বিস্তৃর্ণ চলনবিল। চলতি মৌসুমে যদি আবহাওয়া অনুকুল থাকে, তাহলে চলনবিল থেকে প্রায় ১২’শ থেকে ১৫’শ মেট্রিক টন মধু আহরিত সম্ভবনা রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি কেজি সর্বনি¤œ ১৫০ টাকা হিসাবে প্রায় ২০ থেকে ২৩ কোটি টাকা হবে বলে মৌচাষীরা আশা করছেন। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে অর্থাৎ ২৮ তারিখ থেকে প্রথম পর্যায়ে মধু আহরণ শুরু হয়েছে। প্রায় ৭০০/৮০০ প্রশিক্ষিত মৌখামারি এখন চলনবিলে অবস্থান করছেন ৪০ থেকে ৫০ হাজার মৌবাক্স নিয়ে। উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমিতির সভাপতি চাটমোহরের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম এসব তথ্য দিয়ে বলেন, গত মৌসুমের চেয়ে এবার প্রায় দ্বিগুন মৌবাক্স নিয়ে হাজির হয়েছেন মৌচাষীরা। চলনবিল শুধু মাছের বিলই নয়। এখন মধুরও বিল। মধু উৎপাদনে চলনবিলে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। প্রকৃতিক উপায়ে মধু সংগ্রহের ফলে শুধু মৌচাষীরাই লাভবান হচ্ছেন তাই নয়। চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রওশন আলম জানতে চাইলে বলেন, এতে করে সরষে খেতে পর্যাপ্ত মৌমাছি বিচরণ ঘটছে। সঠিক ভাবে সরষের ফুলে পরাগায়ন (পলিনেশন)ঘটছে। তাতে সরষের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে গেছে অনেক। লাভবান হচ্ছেন কৃষকরাও। আর পরিবেশবিদরা বলছেন, শুধু তাই নয়, উপকৃত হচ্ছে পরিবেশ। ক্ষেতে কীটনাশক ব্যবহার কম হওয়ায়। উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমবায় সমিতি ও কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রের তথ্যানুযায়ী চলনবিলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, গুরুদাসপুর, তাড়াশ, বড়াইগ্রাম, রায়গঞ্জ, সিংড়া ও উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৬২ হাজার ৪৫৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন আগাম ও নাবী জাতের সরষে আবাদ হয়েছে।উত্তরবঙ্গ মৌচাষী সমবায় সমিতির সাধারন সম্পাদক ছাইকোলার আব্দুল আহাদ জানান, কয়েক দিন পরে প্রতি সপ্তাহে মধু সংগ্রহের পরিমান প্রায় ১ লাখ কেজি হবে। তিনি জানান, বর্তমানে মধু প্রতি কেজি ১৫০ টাকা কেজি অগ্রিম বিক্রি হচ্ছে মাঠ থেকে। ভারতের ডাবর কোম্পানী, ঢাকার এপি, প্রাণ, এসিআইসহ ব্যান্ড প্রসাধনী কোম্পানীর এজেন্টরা চলনবিলের মাঠ থেকে অপরিশোধিত মধু অগ্রিম কেনা শুরু করেছে। তিনি আরও জানান, উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলা ছাড়া সব জেলার মৌচাষীরা এবার চলনবিলে মধু সংগ্রহে এসেছেন। এছাড়া দেশে দক্ষিনাঞ্চলের সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, খুলনা, নড়াইলসহ টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের চাষীরা এসেছেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনের মধুচাষীরা চলনবিলে মধু সংগ্রহে আসেন এখন। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে এখানে মধু সংগ্রহ পুরোদমে শুরু হয়।সিরাজগঞ্জের সলঙ্গার সিনিয়র মৌচাষী আবদুর রশীদ জানান, দেশী মধু এখনো জনপ্রিয় হয়নি। ভারত ও অষ্ট্রিলিয়ার ব্যান্ড মধু বাজার দখল করে রেখেছে এখনো। ক্ষেত্রে সরকারী সহায়তা প্রয়োজন। একই জেলার চান্দাইকোনার চাঁন মিয়া ও শাহজাদপুরের সাইদুল ইসলাম জানান, চলনবিলে এভাবে ৬ থেকে ৭ সপ্তাহ সরষের ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করা হবে। পাবনার ঈশ্বরদীর ফরমান আলী জানান, চলনবিলে মধু সংগ্রহের উজ্জ্বল সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। প্রতি বছরই বাড়ছে সরষের আবাদ। এখানকার সংগৃহীত মধু দেশের চাহিদা মিটিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশেও রপ্তানী করা সম্ভব। আর মধু সংগ্রহের মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। চাটমোহর উপজেলার মৌচাষী আসলাম শিকদার এবার ১২০ টি মৌবাক্স নিয়ে চলনবিলে মধু সংগ্রহ করছেন। তিনি জানান, এই বাক্সে তিনি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ কেজি মধু সংগ্রহ করছেন। আসলাম বলেন, যার যতো মৌবাক্স, তিনি ততবেশী মধু সংগ্রহ করছেন। এবার আগাম ও নাবী জাতের সরষে আবাদ হওয়ায় মৌচাষীরা ২ থেকে আড়াই মাস মধু সংগ্রহ করতে পারবেন বলে জানান উল্লাপাড়ার মোহনপুরের সিরাজুল ইসলাম। তাড়াশ উপজেলায় ‘পরিবর্তন’ নামের একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংগঠন এর নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক রাজু বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবত আদিবাসীদের মৌচাষ প্রশিক্ষন দিয়ে আসছি। তাড়াশের পুংরুহালী-মুন্ডুমালা গ্রামের আদিবাসী নারী দীপলী বালা মাহতো জানান, কাঠের ফ্রেমের একটি রানী মৌমাছির সাথে প্রায় ৩০০ শ্রমিক মৌমাছি নিয়ে একটি মৌবাক্স করা হয়। দীপালী মাহতো জানান, চলতি মৌসুমে তাড়াশ এলাকায় তারা ২৫ জন আদিবাসী নারী মধু সংগ্রহ করছেন। পাবনার ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প সংস্থা (বিসিক) এর ডিজিএম বলেন, মৌচাষীদের প্রশিক্ষন বিসিক থেকেই দেওয়া হয়ে থাকে নিয়মিত। তিনি বলেন, মৌচাষীদের হিসাবের চেয়ে বেশী মধু সংগ্রহ হয়ে থাকে। কারন, সরষের মৌসুমে মৌবাক্স ছাড়াও চলনবিলের গ্রামাঞ্চলের গাছে গাছে মৌমাছিরা মৌচাক বানায়। সেখান থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমান মধু সংগৃহীত হয়। তিনি বলেন, চলনবিলে এখন ভরা মধু সংগ্রহের সময়। তার ভাষ্যমতে, এবার চলনবিলে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকার মধু আহরিত হবে।

বার্তা বাজার.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।